spot_img

সার্জিও রামোস টাইম- ৯২.৪৮

২০১৪ সালের ২৫ মে’র প্রথম প্রহর!

ঘড়ির কাঁটা তার নির্দিষ্ট গতিতে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে, পিনপতন নীরবতা পর্তুগাল থেকে স্পেন হয়ে সূদুর বাংলাদেশের মাদ্রিদিস্তাদের ঘাটিতে। শেষ মুহুর্তের খেলা চলছে। যে কোন সময়েই বেজে উঠবে রেফারির বাঁশি, চ্যাম্পিয়নস লীগের শিরোপাটা আরেকবার ফসকে যাচ্ছে গ্যালাক্টিকোসদের৷ ডু অর ডাই মুহুর্ত, কর্নার পেলো রিয়াল মাদ্রিদ।

- Advertisement -

লুকা মড্রিচ বল নিয়ে যাচ্ছেন, চারদিকে নিস্তব্ধতা, শট মারলেন ক্রোয়েশিয়ান জাদুকর। সবাই কে টেক্কা দিয়ে একধাপ উপরে লাফিয়ে উঠলেন রিয়াল মাদ্রিদের ডিফেন্ডার সার্জিও রামোস। স্প্যানিশ গ্লাডিয়োটরের মাথা ছুঁয়ে কর্তোয়াকে ফাঁকি দিয়ে বল জালে জড়ালো৷ নিস্তব্ধতা ভেঙে চারদিকে তখন উল্লাসে ফেটে পড়লো মাদ্রিদিস্তারা। লিসবনের সেই ফাইনালে এরপর বেল, মার্সেলো আর রোনালদোর গোলে ১-১ থেকে ৪-১ এর জয় নিয়েই লা ডেসিমা উদযাপন করে ঐতিহ্যবাহী রিয়াল মাদ্রিদ অমর হয়ে যায় ৯২.৪৮ মিনিট, মাদ্রিদিস্তারা পেয়ে যায় সারাজীবনের টোটকা।

sergio-ramos-vs-atlatico-madrid-champoions-league-final-match
চ্যাম্পিয়ন্স লীগের ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ের ৯২.৪৮ মিনিটে রামোসের হেড

রামোসের শেষ মুহুর্তের জাদু কিন্তু সেখানেই থেমে থাকেনি। উয়েফা সুপার কাপের ফাইনালে সেভিয়ার বিপক্ষে আবারো তার নাটকীয় গোল, ৯২.৩৪ মিনিট। সেই মৌসুমেই এল-ক্লাসিকোতে বার্সেলোনার বিপক্ষে ৯০ মিনিটের গোল৷ আর দেপারটিভো লা করুনার বিপক্ষে ৯২+ মিনিটে গোল করে লা-লিগাটাও উপহার দিয়েছেন প্রিয় গ্যালাক্টিকোসদের৷ ফুটবলে “ফার্গি টাইম” প্রচলিত ছিলো, ততদিনে চারদিকে নাম ছড়িয়ে পড়লো “রামোস টাইমের”ও!

স্পেনের আন্দালুসিয়ার প্রান্তে রামোসের গল্পের শুরু, কুইভার নদীর তীরে শৈশব কাটানো রামোসের শুরুটা স্থানীয় ক্লাব কামাসের হয়ে। এরপর ১০ বছর বয়সে প্রথম ডাক পান সেভিয়া এফসি ক্লাবের ছোটদের দলে, সেখান থেকে সেভিয়া বি টিম হয়ে মূল দলে। সামনে এগিয়ে চলার শুরুটাও তখন থেকেই৷ ২০০২ সালে স্পেনের অনূর্ধ্ব ১৯ দলের হয়ে ইউরো চ্যাম্পিয়নশীপ খেলেন, ২০০৩ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে সেভিয়ার মূল দলে ডাক পান।

প্রথম বছরেই লা-লীগার বর্ষসেরা উদিয়মানের খেলোয়াড় নির্বাচিত হোন, নজরে পড়ে যান ইউরোপের বড় দলগুলোরও।২০০৫ সালে রেকর্ড ২৭ মিলিয়নে তাকে কিনে নেয় রিয়াল মাদ্রিদ, একজন উদিয়মানের জন্য এত টাকার অফার ফিরিয়ে দিতে পারেনি সেভিয়াও, তরুণ রামোসও তাই জন্মভূমি ছেড়ে পাড়ি জমান রাজধানীতে৷

কিংবদন্তী ফার্নান্দো হিয়েরার ” ৪ ” নম্বর জার্সি পেলেন, গ্যালাক্টিকোসদের সেই যুগে নিয়মিত মাঠেও নামতে লাগলেন। জিদান, রোনালদো লিমা, বেকহ্যাম, ফিগো, ক্যাসিয়াস, রাউল, গুতিদের ভিড়ে নিতান্তই সদ্য ফুলের কুড়ি তখন সার্জিও গার্সিয়া রামোস। প্রথম দুই মৌসুম খেললেন সেন্টার ব্যাক হিসেবে, এরপর পেপে, মিটজেল্ডার আসার পর সরে গেলেন একটু ডানপাশে৷ আর ডিফেন্সে গোল রক্ষার পাশাপাশি দরকারে দলের হয়ে গোলও করতে লাগলেন।

০৬/০৭ মৌসুমে এল-ক্লাসিকোতে তার গোলেই কাতালানদের টেক্কা দিয়ে ৩০তম লা-লিগা জিতে লস ব্লাঙ্কোস রা৷ পরের মৌসুমে তার পাসেই আর্জেন্টাইন গঞ্জালো হিগুয়েনের গোলে ওসাসুনাকে হারিয়ে রিয়ালের ট্রফির ক্যাবিনেটে নিয়ে আসে ৩১ তম লা-লীগার শিরোপাটাও। একই বছর প্রথম বারের মতো দেশের হয়ে জিতেন ইউরো চ্যাম্পিয়নশীপ৷ জায়গা করে নেন ফিফা আর ইউরোপের বর্ষসেরার সেরা একাদশেও।

ডিফেন্ডার হিসেবেই ক্যারিয়ার শুরু করা এই লোকটার জুড়ি নেই আক্রমণ ভাগেও৷ সেট পিস, ফ্রিকিক, কর্নার থেকে আসা বলে উড়ন্ত বুলেট গতির হেড। একজন পারফেক্ট ফুটবলারের ডিফেনিশন এই স্প্যানিশ সম্রাট। ২০১৫ সালে যখন ঘরের ছেলে ক্যাসিয়াসকে রিয়াল মাদ্রিদ ছেড়ে দেয় তখন তার অধিনায়কত্বের শূন্যস্থান কে পূর্ণ করবে সেই প্রশ্নই বড় আকারে দাঁড়ায়, যা এক তুড়িতেই উড়িয়ে দিয়ে মাদ্রিদিস্তাদের আগলে রাখেন এই গ্লাডিয়েটোর৷

একমাত্র অধিনায়ক হিসেবে টানা ৩ টা চ্যাম্পিয়নস লীগের শিরোপা উঁচিয়ে ধরেছেন। একদিকে সমালোচকদের তীর তার শরীরে ছুঁয়েছে তার আক্রমনাত্মক মনোভাবের কারনে, লাল আর হলুদ কার্ডের ছড়াছড়ি তে। অন্যদিকে অর্জনের স্পর্শে সে পৌছে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

দেশের হয়ে জিতেছেন ব্যাক টু ব্যাক ইউরো চ্যাম্পিয়নশীপের শিরোপা, মাঝে জিতেছেন আরাধ্যের সোনার বিশ্বকাপও। ইউরো জিতেছিলেন যুবদলের হয়েও৷ ক্লাবের হয়ে জিতেছেন,

৪ টা লীগ শিরোপা,
৪ টা চ্যাম্পিয়নস লীগ,
৪ টা ক্লাব বিশ্বকাপ,
৩ টা উয়েফা সুপার কাপ,
৩ টা স্প্যানিশ সুপার কাপ,
২ টা কোপা ডেল রে।

ডিফেন্ডারদের মধ্যে সর্বোচ্চ ১১ বার ফিফার বর্ষসেরা একাদশে এসেছেন, উয়েফার সেরা একাদশে ছিলেন ৮ বার। চ্যাম্পিয়ন লীগের বর্ষসেরা একাদশে ছিলেন ৪ বার, লা-লীগায় সেরা ডিফেন্ডার হয়েছেন ৫ বার৷ ইউরো চ্যাম্পিয়নশীপের সেরা একাদশ, কনফেডারেশন কাপের সেরা একাদশ, এমনকি ছিলেন বর্ষসেরা বিশ্বকাপের একাদশেও।

আজকের খেলা কখন, কোন চ্যানেলে দেখতে ক্লিক করুন

ক্লাব বিশ্বকাপের গোল্ডেন বল জিতেছেন, ডিফেন্ডার হয়েও একবার হয়েছিলেন ক্লাব বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ স্কোরারও। ইদানিং পানেনকা পেনাল্টি কে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া এই যোদ্ধা মাঠের ভিতর সতীর্থ দের বিপদে সবার আগে এগিয়ে আসেন। ঢাল হয়ে রক্ষা করেন শত্রুর হাত থেকে।

সমালোচকদের কাছে যতটা ঘৃনার আক্রোশে বিদ্ধ হোন, তার চেয়েও অধিক ভালোবাসা পান কোটি ভক্তের কাছে থেকে। গ্লাডিয়েটোর, রক্ষাকারী, কত নামেই না ডাকে মাদ্রিদিস্তারা তাদের অধিনায়ককে।

লেখাটি শেয়ার করুন

spot_img

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Related articles

[td_block_9 sort=”alphabetical_order” category_id=”” custom_title=”আরো খবর” limit=”6″ td_ajax_filter_type=”td_popularity_filter_fa”]
বিজ্ঞাপনspot_img

LATEST ARTICLES

2,875FansLike
8FollowersFollow
854FollowersFollow
80SubscribersSubscribe