spot_img

নিজের বই বার্ন টু রাইজ এ ২০১২ সালের রূপকথার গোলের বর্ণনা দিলেন সার্জিও আগুয়েরো।

ম্যানচেস্টার সিটির স্ট্রাইকার সার্জিও আগুয়েরো তাঁর বার্ন টু রাইজ বইয়ের একটি সূচনায় ২০১২ সালের প্রিমিয়ার লিগের ইতিহাসের সবচেয়ে নাটকীয় গোলের গল্পটি বলেছেন।

- Advertisement -

নিজের বইয়ের সূচনালগ্নে তিনি ২০১২ সালে কিউপিআরের বিরুদ্ধে করা গোলটির স্মৃতি রোমন্থন করেছেন। যেখানে ইনজুরি টাইমে সম্পূর্ণ নাটকীয় ও কল্পনাতীতভাবে গোল করে ম্যানচেষ্টার সিটিকে শিরোপা এনে দেন  ম্যানচেষ্টার সিটির এই স্ট্রাইকার।

“আমি একদিক থেকে চাই ২০১২ সালে ১৩ মের ঘটনাটা  আমার থেকে দুরেই থাকুক! পুরো মৌসুমের কঠোর পরিশ্রম মাত্র এক ম্যাচেই ধুলিস্যাৎ হতে চলেছিলো! এবং আমাদের হাতে মাত্র ৯০ মিনিট ছিলো সবকিছু ঠিকঠাক রাখার, দীর্ঘ ৪৪ বছর পর প্রিমিয়ার লীগের শিরোপা হাতে তোলার”

ফ্ল্যাশব্যাক

২০১২ সালের ১৩ই মে ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। পয়েন্ট টেবিলে ম্যানচেষ্টার ইউনাইটেড এবং ম্যানচেষ্টার সিটি দুই দলেরই শেষ ম্যাচে মাঠে নামার আগে পয়েন্ট সমান ৮৬! ঘরের মাঠে জিতলেই গোল ব্যাবধানে শিরোপা ম্যানচেষ্টার সিটির হাতে যাবে।

ম্যানচেষ্টার সিটির খেলা নিজেদের ঘরের মাঠে দুর্বল কিউপিআরের বিরুদ্ধে অপরদিকে স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের ম্যানচেষ্টার ইউনাটেডের খেলা সান্দারল্যান্ডের ঘরের মাঠে। ২০ মিনিটের মাথায় ওয়েন রুনির গোল ইউনাইটেড সমর্থকদের উল্লাস বাড়িয়ে দিলেও বিরতির আগে স্টেডিয়ামে সমর্থকদের উল্লাসে কিছুটা পানি ঢেলে দিলো সিটির গোলের খবরে….

বিরতির পর কিছু সময় পরপরই সান্দারল্যান্ডের স্টেডিয়ামে উল্লাস, ইউনাইটেড খেলোয়াড়রা দেখতে না পারলেও বুঝতে পারছে কিছু একটা হয়েছে তাদের সুযোগ হয়েছে শিরোপা জয়ের।

চরম উত্তেজনা মাঠে, শেষ বাঁশি বেজে গেছে অ্যালেক্স ফার্গুসন শীর্ষদের পিঠ ছাপড়ে দিচ্ছেন উল্লাসের অংশ হতে সবাই প্রস্তুত……

শিরোপা হাত ছাড়া শুনে মাথায় হাত ইউনাইটেড খেলোয়াড়দের
শিরোপা হাত ছাড়া শুনে মাথায় হাত ইউনাইটেড খেলোয়াড়দের

ওহহহহহ মাই গডডডড

হোয়াড *** দ্যা ***

কি হচ্ছে এসব!!!

অবিশ্বাস্য হতেই পারেনা……………………

আগুয়েরো-

আমরা কিছুটা নার্ভাস ছিলাম, উত্তেজিতও ছিলাম। আসলে আমরা ইতিহাসের অংশ হতে উদগ্রীব ছিলাম। এখানে কোন ভুল করা যাবেনা ভাগ্যের উপর ভরসা করা যাবেনা আবার আক্ষেপও করা যাবেনা। ঐদিনটি সুড়ঙ্গ পথ ধরে পিচের দিকে হেঁটে আসা একটু অন্যরকম ছিলো অন্য স্বাভাবিক সময়ের মতো নয়।

অবশ্যই সমর্থকরা আমাদের উষ্ণ অভ্যর্থণা দিয়েছিলো কিন্তু সারা বছর পিছন থেকে আমাদের সমর্থন দিয়ে যাওয়া সমর্থকদের চিন্তা, হট্টগোল বিষয়টিকে আরো উত্তেজিত করে তুলেছিলো।

পাবলো জাবালাতা যখন বিরতির আগে আমাদের হয়ে ১ম গোলটি করে তখন সবার মাঝে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে। আমরা স্বস্তি নিয়েই মাঠ ছাড়ি এবং কিউপিআর কার্যত তেমন  কান কৌশল না করায় আমাদের সন্দেহ কমতে শুরু করে।

কিন্তু বিরতির পর হঠাৎ ম্যাচটির মোড় পুরোপুরি ঘুরে যায়! ৪৮ মিনিটে কিউপিআরের সমতায় ম্যাচটাকে পুরোপুরি উত্তেজিত করে তোলে ৫৪ মিনিটের দিকে আমি কার্লোস তেভেজকে মাঠে পড়ে যেতে দেখি আমি দেখতে চেয়েছিলাম কি হয়েছে কিন্তু হঠাৎ করেই তেভেজ উঠতে উঠতে পুরোপুরি উত্তেজিত হয়ে উঠে এবং ফাউল করা জয় বার্টনকে কিছু বলতে থাকে স্প্যানিশ ভাষায় যার অনুবাদ করলে দাঁড়ায় “খারাপ দুধ” এর কাছাকাছি।

এবার আমি দেখতে পেলাম বার্টন আরো উত্তেজিত হয়েছে তাই দুজনকে থামাতে এগিয়ে গিয়েছিলাম এবং বার্টনকে শান্ত হতে বলেছিলাম। সে পুরো উত্তেজিত ছিলো এবং ভেবেছে আমি তাকে অন্য কিছু বলছি, রেফারি এসে বার্টনকে রেড কার্ড দিয়ে দিলেন, বার্টন মাঠ ছাড়ার সময় পাশ থেকে আমাকে লাথি দিয়ে যায়! আমি আজও জানিনা কেন সে এমনটি করলো? আমি আজও তার থেকে এই উত্তরটি জানতে আগ্রহী কারন আমার কোন খারাপ উদ্দেশ্য ছিলোনা।

টিভিতে আজকের খেলা কার, কখন দেখতে

সুতারং আমরা কিছুটা স্বস্তি পেলাম যে কিউপিআর এখন ১ জন কম নিয়ে খলতে হবে এবং আামাদের হাতে এখনো ৩৫ মিনিট সময় আছে। কিন্তু আমাদের একজন বেশি আছে এই ভাবনা থেকেও হয়তো আমরা খুবই খারাপ খেলা শুরু করি। আমাদের হঠাৎ করে কিছুই সঠিক হচ্ছিলো না, কোন স্পেস ক্রিয়েট করতে পারছিলাম না উল্টো ঠিক এরই মধ্যে আমরা কিউপিআরের কাছ থেকে দ্বিতীয় গোলটি খেয়ে বসি!

এরপর খুব দ্রুত সময় চলে যাচ্ছিলো আমাদের একের পর এক প্রচেষ্টা কিউপিআর শক্তভাবে ঠেকিয়ে দিচ্ছে। পুরো মাঠে সমর্থকদের আস্ফালন যেন আমাদেরও ঘিরে ধরেছে। এরই মাঝে সহকারী রেফারি জানিয়ে দিলেন খেলার মূল সময় শেষ যোগ করা সময় মাত্র ৫ মিনিট!

আমরা বুঝতে পারলাম আর ৫টি মিনিটই আমাদের হাতে আছে ইতিহাসের অংশ হতে চাইলে। শেষ ৫ মিনিটে আমাদের ২ টি গোল করতে হবে! আমরা একের পর এক চেষ্টা করতে থাকি অতিরিক্ত সময়ের ২য় মিনিটের সময় ডেভিড সিলভার কর্নার কিক থেকে যখন ইডিন ডেকো মাথা ঠেকিয়ে বল জালে জড়ায় পুরো স্টেডিয়াম আবারো উত্তেজিত হয়ে উঠে আমরা বিশ্বাস করা শুরু করি আমাদের আরেকটা সুযোগ রয়েছে হয়তো আমরা পারবো…….

ঘড়ির কাঁটায় ৯৫ মিনিট ছুঁই ছুঁই যেকোন মুহুর্তে রেফারি তার শেষ বাশিঁ বাজাবে, সুতারং করলে এখনই নয়তো কখনোই নয়। আমরা একটি থ্রো-ইন পেয়েছিলাম তখন, চেষ্টা ছিলো যতটা সম্ভব লম্বা করে সামনে বাড়ানো যায় বলটি যদিও এটা আমাদের খেলার সাথে যায়না। তাই আমি একটু নিচে এসে নাইজেল ডি জং থেকে বলটি রিসিভ করি এবং মারিও বালেত্তলির দিকে সামনে বাড়াই। মারিও বলটি নিয়ে এগুতে চাইলে চ্যালেঞ্জের সম্মুক্ষিন হয় এবং সে পড়ে যায়।

তবে মারিও পড়তে পড়তে কোন রকমে বলটি আমার দিকে এগিয়ে দিতে সক্ষম হয়। আমি শুট করার মতো কোন অবস্থানে ছিলাম না। আমি বলটি কিউপিআরের তাহে তাহিও থেকে সামনে বাড়ানোর চেষ্টা করি এবং অনুভব করি আমার পায়ে কিছু লেগেছে, অল্প সময়ের জন্য আমার মাথায় পেনাল্টি আদায়ের কথা আসলেও খুবই দ্রুত আমি বুঝতে পারি এটি খুবই সামান্য টাচ ছিলো, তাই আমি সামনে এগিয়ে যাওয়ার চিন্তা করি।

আমার মাথায় তখন একটাই চিন্তা ছিলো এটাই আমার শেষ সুযোগ হয়ে এসেছে এবং আমাকে এটা কাজে লাগাতে হবে- আমি আমার সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে শুট করি এবং আশা রেখেছিলাম কিছু একটা হবে।

আমি দেখতে পেলাম বলটা জালে জড়িয়ে যাচ্ছে এবং সাথে সাথেই পুরো স্টেডিয়াম জুড়ে তীব্র চিৎকারে ভেসে যাচ্ছে আমি দ্বিগবিদিক হয়ে আমার জার্সি খুলে মাথার উপর ঘোরাতে ঘোরাতে দৌড়াতে থাকি, এবং এটা অবিশ্বাস্য ছিলো।

সার্জিও আগুয়েরোর অবিশ্বাস্য গোলের মুহুর্ত
সার্জিও আগুয়েরোর অবিশ্বাস্য গোলের মুহুর্ত

আমি বুঝতে পেরেছিলাম সময় শেষ এবং এই গোলটি আমাদের ইতিহাসের অংশ করে দিয়েছে, আমরা শিরোপা জিতে গেছি কিন্তু তারপরও ততক্ষন পর্যন্ত আমার হতভিম্বতা কাটেনি যতক্ষন পর্যন্ত না আমার টিমমেটরা আমাকে জড়িয়ে ধরে মাঠে ফেলে দিয়েছিলো। তারা সকলেই বলতে থাকলো আমরা তোমাকে ভালোবাসি….।

মারিও আমাকে জড়িয়ে ধরে বললো ইউ **** ইডিয়ট! আই লাইভ ইউ বিগ ******

আমরা বল আবারো সেন্টার করার জন্য আবার যাই, সমান্য সময় লাগলো রেফারির বাঁশি বাজাতে দেখলাম গ্যালারি চিৎকারে ভেসে যাচ্ছে সবাই দৌড়ে মাঠে ঢুকে পড়ছে! আমি তখনও পুরো হতবিহ্বল ছিলাম, মনে হচ্ছিলো কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না কি হতে যাচ্ছে? সবাই এসে আমাকে উপরে তুলে ধরে আমাকে বলতে থাকে আমরা তোমাকে ভালোবসি….. আমার মনে হচ্ছে আমি এখনো হতবাক হয়ে আছি।

আগুয়েরোর গোলের পরপরই পুরো স্টেডিয়ামে দর্শক মাঠে নেমে আসে!
আগুয়েরোর গোলের পরপরই পুরো স্টেডিয়ামের দর্শক মাঠে নেমে আসে!

আমি এখনো পিছনে ফিরে তাকালে উত্তেজনা অনুভব করি। আমার মনে হয় আমরা এটা সাধারণভাবে করতে পারতাম; আমরা নির্বোধ। তবে আমরা এটা করেছি অত্যন্ত নাটকীয় ভাবে কল্পানারও বাহিরে গিয়ে, আমার মনে হয়না সে সময় আমাদের কারো আর কিছু চাওয়ার ছিলো এর চাইতে।

৪৪ বছর পর শিরোপা হাতে ম্যানচেষ্টার সিটির উল্যাস
৪৪ বছর পর শিরোপা হাতে ম্যানচেষ্টার সিটির উল্যাস

এক কাব্যিক ম্যাচের শেষ হলো মহা-কাব্যিক ভাবেই, ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে যা চিরকাল।

 

লেখাটি শেয়ার করুন

spot_img

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Related articles

আরো খবর

বিজ্ঞাপনspot_img

LATEST ARTICLES

2,875FansLike
8FollowersFollow
942FollowersFollow
81SubscribersSubscribe
Zakir Mahmud
Zakir Mahmudhttps://footcricinfo.com
Hi Everyone I'm Zakir Mahmud, professionally I'm an engineer. But I love sports & I love to explore it with all the sports lovers in the world. That's why I write about sports & off-course I steel learning but I'm confident about my work. I hope you enjoy it. Thank you & love.....