শচীন রমেশ টেন্ডুলকার- পর্ব ২

- Advertisement -

১ম পর্ব পড়েতে ক্লিক…. 

ছোটোবেলা থেকেই ছিলেন ক্রিকেটের জন্য পাগল, সবকিছু ছেড়ে যদি ক্রিকেট ম্যাচ চলে টিভিতে, তাহলে পাগলের মতোন সারাদিন ওই সাদাকালো টিভির সামনে বসে থাকা, এমনকি, তিরাশির বিশ্বকাপ জয় কে প্রত্যক্ষ করে, ভারতের ফ্ল্যাগ নিয়ে নিজের জানলায় টাঙিয়ে রাখা, এসব ছাড়ুন। আসবো আরেকটু পুরনো কথায়, বাবা রমেশ টেন্ডুলকার ভেবেছিলেন, যে তার ছেলেও হয়তো তার ই মতোন কবিতা-উপন্যাস-ছোটোগল্পের জগতে যাবে, তাই প্রিয় সুরকার শচীন দেববর্মনের নামে নাম রেখেছিলেন।

মা ভেবেছিলো, ছোটো ছেলে হয়তো ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হবে, নাহলে নিদেনপক্ষে সরকারী চাকুরে। কিন্তু, বিধির ভার্ডিক্ট ছিলো অন্যকিছু! শিল্পের সেরা শিল্পী সে হয়ে উঠেছিলো, তাকে নিয়েই একটা গোটা জাতি স্বপ্নে মজেছিলো। সবুজ ঘাসের উপর সত্যনিষ্ঠ আর চারণক্ষেত্রের বাইরে ছিলেন তিনি প্রতাপশালী। তেরঙা পতাকার প্রতি তাঁর ছিলো অকৃত্রিম ও অখন্ড ভালোবাসা। সেই সঙ্গে তাবড় তাবড় বোলারদের প্রতি তিনি ছিলেন ক্রূর প্রকৃতির।

সালটা, ১৯৮৯, ভারতের পাকিস্তান সফর।

পাকিস্তানের টিমে তখন কে নেই!
ইমরান, ওয়াসিম আকরাম, ওয়াকার ইউনিস, আব্দুল কাদির, মিয়াঁদাদ, রামিজ।
কিন্তু, সেই পাকিস্তান সফরেই, নির্বাচক বোর্ডের রাজ সিংহ দুঙ্গারপুর একটা বাচ্চা ছেলেকে নির্বাচিত করলেন, কপিল, গাভাস্কার,শাস্ত্রী দের টিমে। অনেকেই রাজকে বারন করেছিলেন, এতো অনভিজ্ঞ একটা ছেলেকে চান্স দিতে। কিন্তু, রাজ সিংহ দুঙ্গারপুর শুনেছিলেন, এই ছেলেটাই বিনোদ কাম্বলির সাথে জুটি বেঁধে, ইন্টার স্কুল শীল্ডে 326* নট আউট স্কোর করেছে। আর ওই শর্ট হাইটের বাচ্চা ছেলেটাও মান রেখেছিলো সিলেক্টর এর। এক ওভারে আঠাশ রান ও তুলেছিলো, আব্দুল কাদিরের মতোন বিষাক্ত স্পিনারের বলের এগেইনষ্ট এ, (৬-৪-০-৬-৬-৬)।

ঠিক সেই যায়গা থেকেই লিগ্যাসি শুরু।বাকিটা ইতিহাস

সাল ১৯৯৮, ত্রিদেশীয় সিরিজ, সচিনকে আউট করে উদ্দাম উল্লাস বেরিয়ে এলো জিম্বাবোয়ের ক্রিকেটার হেনরি উলঙ্গা থেকে। মাষ্টার -ব্লাষ্টার শান্ত মাথায় ফিরে গেছেন। এ যেন উত্তাল ঝড়ের মুখে এক শান্ত-নিস্তব্ধ বিকেল! ২ দিন পরে হেনরিকে পিটিয়ে ৬ ওভারে তুলে ফেললেন ৫০ রান। তুমি দু ঘাত দান করলে আমি চার ঘাত ফিরিয়ে দেবো… মাষ্টার জানতেন ব্যাটের কোথায় লাগলে ব্রেট-লি’র ডেলিভারিটা সোজা গিয়ে আঘাত করবে মেলবোর্নের ৯১ মিটার দূরে শিথীল হয়ে যাওয়া দড়িতে, আর কোথায় আঘাত করলে শোয়েবের দেড়শো কিমি বেগের ডেলিভারি ঈগলের মতো উড়ে গিয়ে থাবা বসাবে হাজার হাজার মানুষের ভীড়ে !

সময় বদলেছে। নদীর স্রোতের সাথে, ঋতু পরিবর্তেনের সাথে সাথে এসেছে নতুন পাখি। তারা সকলেই পরিযায়ী। ব্রেট লি, শেন ওয়ার্ন, শোয়েব, সাকলাইন মুস্তাক, শেন বন্ড, ম্যাকগ্রা,স্টেইন, আকরাম, ওয়াকার, গিলেস্পি, ডোনাল্ড, পোলক এর মতো যত বড়ো বড়ো কাঠঠোকরা পাখিরাই এসে ঠুকরে গেছেন ৫ ফুট ৫ ইঞ্চির এই বৃক্ষে কেউই তাঁর ধ্বংসের হদিস পাননি। উপরন্তু নিজের টিস্যুর মধ্যে দিয়ে বিষাক্ত ইনস্যুইং, বাউন্সার, গুগলি, দুসরা, আউটস্যুইংয়ের পুষ্টি সাগ্রহে বিলিয়ে দিয়ে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছিলেন। শিরদাঁড়াটাই তো আসল…

টিভিতে আজকের খেলা কার, কখন দেখতে

সময় বদলেছে, বদলায়নি ওই ছোটোখাটো হাইটের ছেলেটার ব্যাটের জোর। ম্যাকগ্রা হোক বা গিলেসপি, ওয়ার্ন হোক বা মুরালি, ওয়াকার হোক বা ওয়াসিম, পৃথিবীর সমস্ত সেরা বোলারদের রাতের ঘুম ছোটানো আতঙ্ক হয়ে উঠেছিলো, ওই মিষ্টি হাসির পাঁচ ফুট পাঁচ ইঞ্চি হাইটের ছেলেটি। স্পিনের জাদুকর শেন ওয়ার্ন, যিনি লেগ স্ট্যাম্পের বাইরে বল ফেলে অফস্ট্যাম্প উড়িয়ে দিতেন, যিনি সারা পৃথিবীর ব্যাটসম্যানদের আতঙ্ক ছিলেন, তিনিও দুঃস্বপ্নে ওই মারাঠি ছেলেটাকেই দেখতেন। সবচেয়ে বেশী মার ও ওই ছেলেটার ব্যাটের ইনসাইড এজ থেকেই ওয়ার্ন খেয়েছেন।

আর রেকর্ডের কথা কি বলবো?

২০০ টা টেষ্ট ম্যাচে ১৫,৯২১ রান, ৪৬৩ টা ওয়ান ডে ইন্ট্যারন্যাশনাল এ ১৮,৪২৬ রান, এবং একমাত্র একশো টি সেঞ্চুরি স্কোরার ও একমাত্র ওয়ান ডে র দুশো রান স্কোরার হয়ে, ওই মারাঠী ছেলেটা হয়ে উঠেছিলো, সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যান। তাই, আজও ভারতের এবং পৃথিবীর বিভিন্ন কোনে, যেই অঞ্চলের ছেলে হোক বা মেয়ে, ভালোবেসে যখন উইলো কাঠের তৈরী ওই ব্যাট নামক জিনিসটাকে হাতে তোলে, কোথাও না কোথাও সেই ছেলেটা বা মেয়েটাও মনে মনে একবার হলেও মারাঠী ওই মানুষ টাকে এক সেকেন্ডের জন্য হলেও স্মরন করে। এখানেই, ওই মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেটা জিতে গেছে। এখানেই ওর সমস্ত অ্যাওয়ার্ড। কারন, একটা সময় মানুষের বিশ্বাস ছিলো,
“যে আর কেউ নেই? সব ব্যাটসম্যান আউট? শচীন খেলছে তো?
ব্যস, তাহলে আর চিন্তা নেই!” আর, এখন সেই বিশ্বাস কিংবদন্তী তে পরিনত হয়ে, ওই দশ নম্বর জার্সীর ছেলেটা আরো কয়েকশো কোটির অনুপ্রেরনা, ধ্রুবতারা ! কারন, যতোদিন মানবসভ্যতা থাকবে, ক্রিকেট বলে খেলাটা থাকবে, ততোদিন এই বিশ্বাসেই অনেকে বাঁচবে, যে শচীন পরিত্রাতা হয়ে আসবেই আবার আমাদের বাঁচাতে। কারন, শচীন রমেশ টেন্ডুলকর শুধুমাত্র একটা নাম নয়, শচীন মানে ভরসা, শচীন মানে বিশ্বাস।

একদিনের ক্রিকেটে যে দ্বিশতরান করেও অপরাজিত থাকা যায় তা এই মানুষে-টি কে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন ছিলো , কঠিন ছিলো এটা বিশ্বাস করাও যে সমগ্র ক্রিকেটীয় জীবনে শততম শতরান কেউ করতে পারে ! যে বাইশ গজে নামা মানে কাশ্মীর থেকে কন‍্যাকুমারী সমগ্র ভারতবাসী কিংবা পুরো ক্রিকেট বিশ্ব অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে টিভির পর্দায় এখনও সেটা খেলোয়াড় হিসেবেও যেমন ছিলো , মেন্টর হিসেবেও তাই আছে । আমাদের জীবনের একটা বড়ো প্রাপ্তি যে আমরা এই লোকটার খেলা দেখতে পেরেছিলাম ।

অনেক খেলোয়াড় আসবে যাবে হয়তো বা উনার রেকর্ড স্পর্শও করবে কিন্তু উনি এক এবং অদ্বিতীয় , যে পৃথিবীতে একটাই আছে ,

ধূসর ক্রিকেটীয় ইতিহাসের পাতায় স্টেইন, ডি-ভিলিয়ার্স, উইলিয়ামসন বা সাঙ্গাকারার লবণ হ্রদের উপরেও কোমল শিলা দিয়ে তিনি গড়েছেন বিধান নগরী। এসেছে অনেক ছোটো গল্প, অনেক গদ্য, কিন্তু শচীন টেন্ডুলকার স্বয়ং একজন উপন্যাস। যার পরিসর সর্বাপেক্ষা দীর্ঘ এবং যাকে ২-৪ লাইনে ব্যক্ত করা নিবিড় ভাবে উপহাসাম্পদ।

লেখাটি শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Related articles

আরো খবর

বিজ্ঞাপন

LATEST ARTICLES

গত দশকের সেরা প্লেয়ার লিও মেসি এবং মার্তা

ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব ফুটবল হিস্টোরি অ্যান্ড স্ট্যাটিসটিকস (আইএফএফএইচএস) এর ১৫০ টি দেশের সদস্যদের ভোটে (২০১১-২০২০) দশকের সেরা নির্বাচিত হয়েছে বার্সেলোনার ইতিহাসের সেরা প্লেয়ার লিও...

রোনালদোর দরকার আর ৩১ গোল!!

৩৫ বছর বয়সে এসে যখন অনেক ফুটবলার অবসরের কথা চিন্তা করে তখন তার উল্টো দিকে চলছে পর্তুগীজ ফুটবলার ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। একের পর এক রেকর্ড...

পিছিয়ে গেলো বিশ্বকাপ ফুটবল

করোনা মহামারির জন্য পিছিয়ে গেছে অলিম্পিক, ইউরোপ কাপ এবং কোপা আমেরিকার মত বড় বড় ইভেন্ট গুলো। তার ধারাবাহিকতায় এবার পিছিয়ে গেলো বিশ্বকাপ ফুটবল। ২০২১...

পেলেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে মেসি

আর্জেন্টিনা এবং বার্সেলোনার সুপার স্টার লিও মেসি এক ক্লাবের হয়ে পেলের করা রেকর্ডের পাশে নিজের নাম বসিয়েছেন। গতকাল ভ্যালেন্সিয়ার বিপক্ষে গোল করে এই রেকর্ডের...

বার্তোমেউর অবসান

অবশেষে প্রেসিডেন্ট পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন বার্সেলোনার ইতিহাসের বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট হোসে মারিয়া বার্তোমেউ। মঙ্গলবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় বোর্ড মিটিংয়ের পর বার্তোমেউ এবং বাকি পরিচালকরাও...

১০ জনের দল নিয়েও জয় তুলে নিলো বার্সেলোনা!

লা লীগায় নিজেদের টানা দ্বিতীয় ম্যাচে জয় তুলে নেয় এফ সি বার্সেলোনা। গতরাতে এটি ছিলো বার্সার এ সিজনে প্রথম এওয়ে ম্যাচ। গত সিজনে এওয়ে...
2,874FansLike
8FollowersFollow
810FollowersFollow
79SubscribersSubscribe