spot_img

“পেলে কিংবা ম্যারাডোনা নয় , আমি বড় হয়ে জিদান হবো ”

- Advertisement -

২০০৬ বিশ্বকাপ।  ফুটবল বিশ্বকাপের বছর । পাড়ার অলি গলিতে ছেঁয়ে গেছে ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার পতাকা। আবাহনী-মোহামেডান কিংবা রাজনৈতিক আলোচনা ছেড়ে প্রতি পাড়ার মোড়ের চায়ের দোকান কিংবা অফিস চত্বর মেতেছে হুজুক এর স্রোতে ভাসা বাঙালির ফুটবল বিশ্বকাপ নিয়ে । কম্পিউটার, মোবাইল গেম তখনও কাড়তে শেখেনি কৈশোর। পাড়ার কিশোর রা অলিগলিতেই নামিয়ে আনে বিশ্বকাপের আসর। পাড়ায় ফুটবল খেলা কিশোরদের কারও পরণে আর্জেন্টিনার জার্সি তো কারো ব্রাজিল আবার কারও কারও জার্মানি। চলছে জোর তর্ক বিতর্ক। পাড়া পড়শী থেকে শুরু করে যারা খেলা সম্পর্কে টুকটাক খবর রাখতো প্রায় সবাই বলাবলি করছে এবারেও ব্রাজিল জিতবে। বলে রাখা ভালো ঐ বিশ্বকাপেই দলটার প্রতি লাভ এট ফার্স্ট সাইট হয়ে গিয়ে ছিলো।   কিন্তুএতকিছুর মাঝে ও একটা নাম খুব বেশি শুনতে পাচ্ছিলাম। জিদান। যে নাকি তার আগে ব্রাজিলকে হারিয়েছিলো। আমি উৎসাহ নিয়ে তাকে দেখবো বলে বসে আছি। ক্যামেরা তার দিকে তাক করলে তার হাসিমুখ দেখছিলাম।

কিন্তু লোকটা কাবাব এর মধ্যে এভাবে হাড্ডি বনে যাবে। তারকাসমৃদ্ধ ব্রাজিল টিমকে একা নাচিয়েছিলো বুড়ো হাড়ে তারকাখচিত সেই ব্রাজিল টিমে কে ছিলো না।  রোনাল্ডো , রোনাল্ডিনহো , রবিনহো , কাকা , রবার্তো কার্লোস । সবাইকে চমকে দিয়ে সেদিন ম‍্যাচের রেজাল্ট ফ্রান্স ১-০ ব্রাজিল ।  কল্পনায় ও ছিলোনা।  মনে পড়ে প্রথম দেখায় চোখদুটি কতটা  ধারালো মনে হয়েছিলো। আর জাদুকরী ওই পা দুটো। যা দিয়ে  গুঁড়িয়ে দিয়েছিলো শৈশব এর প্রথম ভালোলাগা ব্রাজিলকে,  তবে একটা বিষয় সেদিন এই বুড়ো লোকটার খেলা স্বচক্ষে দেখেছিলাম।  তাই নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি ।  সেদিন এই লোকটার তথাপি ফুটবলের প্রেমে পড়েছিলাম প্রথম বারের জন্য । যদিও দুটো ম‍্যাচ পরেই ফুটবলের মাঠ থেকে চিরবিদায় জানাতে হয় তাকে । বুফোনের সেভটা আটকে দিয়েছিল তার দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়কে ।  কিন্তু কেন জানিনা রাগ হয়নি। সম্মান এসেছিলো, আর শ্রদ্ধা। ফাইনালে খুব চেয়েছিলাম ইটালি জিতুক, কিন্তু বিশ্বকাপ আর ইটালির মাঝে পাহাড় হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। ওই লোকটা। লম্বা, ছিপছিপে, ধারালো চোখ। ছোটবেলা থেকে যে দেখে এসেছে অরাজকতা, গুণ্ডামি।  আজীবন শান্ত স্বভাবের এই মানুষটি ফাইনালে মাতেরাজ্জির কথার উত্তরে সংহারক রূপ ধারণ করেছিলেন।  অতঃপর লাল কার্ড৷ নিজের বোন নিয়ে অশ্রাব্য গালাগালি শুনে সেই গুন্ডাটাই বেরিয়েছিলো। সেইদিন টা নিশ্চয়ই আজও তাঁকে যন্ত্রণা দেয়, কারণ সেটা না করলে হয়তো আরো একটা বিশ্বকাপ তাঁর নামেই লেখা থাকত।  চেয়েছিলাম ইটালি জিতুক, কিন্তু এভাবে নয়। চেয়েছিলাম সে হারুক, কিন্তু মাথা নিচু করে নয়। আজও আমার মনের সেই নিস্তব্ধতা শুনতে পাই, “শেয়টা এভাবে না হলেও তো পারতো !”

Zidane-Birthday
জিনেদিন জিদানের খেলোয়াড় এবং কোচ হিসেবে পরিসংখ্যান

তবে মানতে বাধ্য, লোকটির প্রেমে সেদিনই পড়ে গিয়েছিলাম।তারপর “ক্রীড়া জগৎ “ক্রীড়ালোক এর ম্যাগাজিন ঘেটে ঘেটে জানতে পারলাম প্রায় একক দক্ষতায় ‘৯৮ এর বিশ্বকাপ জিতিয়েছিলেন ফ্রান্সকে এই লোকটি। তাঁর খেলার আভিজাত্য, দক্ষতা , নিজস্বতার জন্যেই হয়ে উঠেছিলেন সকলের প্রিয় জিজু। তবে জিনেদিন জিদান থেকে জিজু হবার পথটাও এতো সহজ ছিল না। ফ্রান্সের মার্সেই শহরে অতি সাধারণ ঘরে জন্ম নেওয়া ছেলেটি বেড়ে উঠেছিল দারিদ্র্যতার সাথে লড়াই করে। ফুটবল অন্তঃপ্রাণ জিদানের ফুটবল অভিষেক হয় ১৯৮১ সালে মার্ক সেন্ট হেনরি নামক একটি ছোট ক্লাবে । ১৯৮৬ তে কান দলের অ্যাকাডেমিতে যোগ দেন এবং ১৯৮৯ তে কান দলের হয়েই সিনিয়র ক্যারিয়ার শুরু করেন জিদান । ১৯৯৬ তে আসা জুভেন্টাস দলে , সেখানে ১৫১ ম্যাচে ২৪ গোল করেন জিজু। মিডফিল্ডের অন্যতম ভরসা হয়ে ওঠেন জিজু । সাল ২০০১ , জুভেন্টাস ছেড়ে প্রাণের ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদ এ যোগ দেন জিদান। ২০০১-০২ এর মওশুমে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ চ্যাম্পিয়ন হয় রিয়াল। একমাত্র ২০০৬ এর বিশ্বকাপ ফাইনাল বাদ দিলে নিজের জার্সিতে কোনোও কলঙ্কের দাগ লাগতে দেননি জিদান। রিয়াল এর হয়ে করেছেন ৩৪ টি গোল ।

এতক্ষণ একজন ফুটবলার এর গল্প বলেছিলাম। শুধু একজন সফল ফুটবলারেই থেমে থাকেনি জিদান এর গল্প। ২০১৬ সালে জিদান নিযুক্ত হন রিয়াল মাদ্রিদ এর ম্যানেজার হিসেবে এবং শুধু একজন ফুটবলার হিসেবে নয় একজন ম্যানেজার হিসেবেও হাতে নেন চ্যাম্পিয়ন্স লিগ। তিনি এখনও রিয়াল এর ম্যানেজারের পদস্থ। গোটা বিশ্বের কাছে নিজেকে উজাড় করে প্রমাণ করেছিলেন থেমে না যাওয়াই আরেক নাম জিজু। স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনও তাঁর সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন –

“Give me Zidane and 10 pieces of wood and I’ll win you the Champions League.”

সালটা ২০১৬,
সান্তিয়াগো বার্নাব্যু শ্মশানের থেকে কোনো অংশে কম ছিল না।
ভেঙে পড়া রসায়ন, সীমাহীন ঔদ্ধত্য এবং পরাজয়ের গ্লানি ধীরে ধীরে সাদা পোশাকে আলকাতরা মাখাচ্ছিলো। ঘরের মাঠে ৪-০ পরাজয়ের পরে ফাটল টা গিরিখাতের আকার ধারণ করছিল। কার্লো আঞ্চেলোত্তি বিদায় নিলেন, এলেন রাফা বেনিতেজ।।
কিন্তু লাভের লাভ বলতে এলো খেলোয়াড় দের অন্তর্দ্বন্দ্ব। ১০ বার ইউরোপ জয়ী দলকে দেখে মনে হচ্ছিলো এদের দ্বারা আর কিছু সম্ভব নয়।

একটু ফ্লাশবাক,
🔴 ২০০৬ সালের কথা মনে পড়ে, সেই মাতারাজজীর বুকে গুঁতো। সেই টাকমাথার লোকটার লাল কার্ড খাওয়া।।।।

🔴৪ঠা জানুয়ারি ২০১৬, মাদ্রিদ
সাদা জামা আর ডেনিম জিন্সে মাঠে নামলেন সেই খলনায়ক। খানিকটা বসন্তের বাতাস যেন বয়ে গেল ইউরোপে ।
আসলে সেটা বিধ্বংসী ঝড়ের পূর্বাভাস।

ডাগ লাইনে দাঁড়িয়ে যে কালো জাদু দেখানো যায়, সেটা আর কে বা জানতো। তারপর, বাকিটা সোনালী পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিখা লিখা হয়ে গেছে।

✅২০১৬- মিলান
✅২০১৭- ওয়েলস
✅২০১৮- কিয়েভ

যেন ক্যালেন্ডারের মতো জার্সির হাতাটাই 11, 12 & 13 লেখালেন।  মাঝে লীগ জয়, সুপারকোপা, ক্লাব বিশ্বকাপ, সুপারকাপ, কি নেই তার ঝুলিতে…..
ব্যক্তিগত সাফল্য হিসেবে THE BEST COACH দিলো fifa।
শুধু কী তাই , তৈরি করলেন এক বীভৎস বুনিপ,

গ্যালাকটিকো টীমের প্রাণভোমরা ছিলেন যেই লোকটি সেই শান্ত মানুষটি রিয়ালে কোচ হয়ে এসেই  ক্লাব ফুটবলের সর্বোচ্চ শিরোপা জিতেন; ব্যাক টু ব্যাক চাম্পিয়নস লীগ সহ।  বর্তমান ফুটবল বিশ্বে যে গুটিকয়েক মানুষ ছাত্র এবং শিক্ষক উভয় ভূমিকাতেই সফল, তাঁদের মধ্যে জিনেদিন জিদান অন্যতম। কোচ হিসেবে তিনি রিয়াল মাদ্রিদকে পরপর তিন বার চ্যাম্পিয়ন্স লীগ জিতিয়ে এক বিশ্বরেকর্ড করেন।

উনি কে ?
আলো না পৌঁছানো বস্তির এক যুবক শিক্ষক
বা
সঠিক রাস্তার সন্ধান দেয়া একজন পিতা মাতা
বা
চাকরি না পাওয়া বন্ধুকে গ্রূমিং করানো এক বন্ধু
বা
কালো কোট পরিহিত এক Gaffer

তিন বছরে তিনটি UCL, খেলোয়াড় জীবনের সাথে কোচিং জীবনেও তুমি সবার সেরা । ধন্যবাদ ২০০৬র সেই চোখ জুড়ানো পারফরম্যান্সের জন্য , ধন‍্যবাদ আমার এবং আমার মতো আরো অনেক কিশোরকে সেদিন ফুটবলপ্রেমী করে তোলার জন্য।

আজ এই মানুষটার জন্মদিন, ফুটবল সৌরজগতের এক সূর্যের জন্মদিন। জিনেদিন জিদানকে জানাই জন্মদিনের আন্তরিক শুভেচ্ছা।।

শুভ জন্মদিন জিনেদিন জিদান…..

লেখাটি শেয়ার করুন

spot_img

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Related articles

আরো খবর

বিজ্ঞাপনspot_img

LATEST ARTICLES

2,875FansLike
8FollowersFollow
940FollowersFollow
81SubscribersSubscribe