spot_img

এলানো ব্লুমার আন্ডাররেটেড এবং আন্ডার-অ্যাচিভার

এলানো ব্লুমার শুনলেই মনে পড়ে যায় ইন্ডিয়ান সুপার লিগের উদ্বোধনী মওসুম কাঁপানো সেই ব্রাজিলিয়ানের কথা। যদিও নিজের দেশের হয়ে তার অবদান বলতে ২০১০ বিশ্বকাপে প্রথম দুই ম্যাচে দুই গোল আর তার আগের বছরের কনফেডারেশন কাপ ফাইনালে পরিবর্ত হিসাবে নেমে ০-২ পিছিয়ে পড়া ব্রাজিল দলকে ৩-২ জেতানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেওয়া ছাড়া মনে রাখার মতো তেমন কিছু নেই।

বিশ্বকাপের ব্রাজিলের দ্বিতীয় খেলায় আইভোরি কোস্টের বিরুদ্ধে গোল করার পরের মিনিটেই গুরুতর চোট পেয়ে বাকি টুর্নামেন্ট থেকে তার ছিটকে যাওয়াটা অবশ্যই দুর্ভাগ্যজনক ছিল, কিন্তু চোট সারিয়ে ফেরার পরেও জাতীয় দলের জার্সি গায়ে আর সেভাবে নজর কাড়তে পারেননি তিনি। বরং ২০১১ কোপা আমেরিকা কোয়ার্টার ফাইনালের টাইব্রেকারে তার পেনাল্টি নষ্ট করার ঘটনা অনেকেই মনে রেখেছেন, যদিও সেই খেলায় ব্রাজিলের কোনো খেলোয়াড়ই স্পটকিক থেকে গোল করতে না পারায় আলাদাভাবে এলানো এর ওপর কেউ হয়তো দোষারোপ করেননি।
অথচ তার ফুটবল কেরিয়ার কিন্তু এর চেয়ে অনেক বেশি বর্ণময় হতে পারতো, অন্তত ম্যানচেস্টার সিটি তার প্রতিভার যেই ছবি দেখেছিল তা সেইরকমই ইঙ্গিত দেয়। যদিও সেই দিনগুলো মনে রাখেনি অনেকেই, হয়তো বা ভুলে গেছেন খোদ সিটির সমর্থকরাও। ২০০৭ সালে যখন স্বেন গোরান এরিকসন সিটির যে দলটির দায়িত্ব নেন সেটি তার আগের মওসুমের প্রিমিয়ার লিগে নিজেদের সবগুলো হোম ম্যাচ মিলিয়ে করেছিল মাত্র দশ গোল। পরিস্থিতি এতটাই দুর্বিসহ ছিল যে সমর্থকরা ভেবেছিলেন পরের মওসুমে আর খেলা দেখতেই যাবেন না। আর ঠিক তখনই দলে আগমন ঘটে এলানোর।
দলে নিজের জায়গা পোক্ত করতে কয়েকটি ম্যাচ সময় নিলেও তারপরেই এলানো হয়ে যান মাঝমাঠের অন্যতম আকর্ষণ যখন মাইকেল জনসনের সঙ্গে তার জুটি প্রায় প্রত্যেক খেলাতেই ক্লিক করতে থাকে। ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে এই সেট-পিস স্পেশালিস্ট নিজের প্রথম গোল করেন ৩০ গজ দূরে পাওয়া একটি ফ্রি-কিক থেকে। নিউক্যাসেল ইউনাইটেডের বিরুদ্ধে অত্যন্ত জোরালো আর ততোধিক নিখুঁত একটি শটে পোস্ট আর ক্রসবারের একেবারে গা ঘেঁষে (অথচ স্পর্শ না করে) টপ-কর্নার দিয়ে ঢোকা তার সেই গোল ছিল সেইবারের প্রিমিয়ার লিগের অন্যতম সেরা গোল। এরপরের খেলাতেই জোড়া গোল করেন তিনি, যার মধ্যে একটি গোল আবারও আসে আরো একটি দর্শনীয় ফ্রি-কিকে যেখানে গতির পরিবর্তে ছিল কার্ল আর টপ-কর্নারের বদলে এবার তিনি বেছে নেন বটম-কর্নার। লিগে সিটির পরবর্তী প্রতিপক্ষ বার্মিংহ্যামের বিরুদ্ধেও গোল পান এই ক্রিয়েটিভ ব্রাজিলিয়ান মিডফিল্ডার, আর পরপর তিন ম্যাচে মোট চার গোল করে তিনি দলকে তুলে ধরেন লিগ টেবিলের শীর্ষস্থানীয় চারটি দলের মধ্যে।
কিন্তু লিগের মাঝপথে জনসনের চোট কিছুটা এলোমেলো করে দেয় এলানোর খেলা। হয়তো সেই সময়েও তার খেলায় ক্রিয়েটিভিটি চোখে পড়ছিল, কিন্তু দেখা যাচ্ছিল না সেই ম্যাচ ঘোরানোর মতো প্রভাবশালী পারফরম্যান্স। ফলস্বরূপ বন্ধ হয়ে যায় তার পা থেকে গোল আসা, এমনকি দুটি ক্ষেত্রে তার পেনাল্টিও বাঁচিয়ে দেন বিপক্ষের গোলরক্ষক; আর সবশেষে এবং সবচেয়ে আশ্চর্যজনকভাবে কোচের তাকে রাইট-ব্যাক হিসাবে খেলানোর সিদ্ধান্ত এলানোর পুরোনো ছন্দে ফেরার সমস্ত রাস্তাই বন্ধ করে দেয় আর আশা জাগিয়ে শুরু করেও ম্যানচেস্টার সিটি লিগ শেষ করে নবম স্থানে। যদিও সেই মওসুমের শেষ দিনে ০-৭ গোলে পিছিয়ে থাকা অবস্থায় তার বিস্ময় গোল বুঝিয়ে দেয় যে তিনি ফুরিয়ে যাননি।
পরের মওসুমে ভালো শুরু করা সত্ত্বেও রিয়াল মাদ্রিদ থেকে আগত “বিগ মানি বাই” রবিনহোকে নিয়ে মাতামাতি আর সিটিতে শেখ মনসুর যুগের সূত্রপাত হতেই এলানোকে কিছুটা ভুলতে শুরু করে তার দল। অধিকাংশ ম্যাচেই মাঠের বদলে তার জায়গা হয় বেঞ্চে। যদিও তার মধ্যেই ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে এলানোর সেরা পারফরম্যান্সটি আসে উয়েফা কাপ কোয়ার্টার  ফাইনালে হামবুর্গের বিপক্ষে, যেখানে প্রথম লেগে ১-৩ গোলের হার আর ফিরতি পর্বের শুরুতেই একটা অ্যাওয়ে গোল হজম করার ফলে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সিটির দরকার ছিল নব্বই মিনিটে কমপক্ষে তিন গোল। সেখান থেকে এলানো ব্লুমার একাই নিজের কাঁধে তুলে নেন সব দায়িত্ব। দুর্ভাগ্যবশত একটি পেনাল্টি আর দুটি অনবদ্য ফ্রি-কিকের মাধ্যমে তার হ্যাটট্রিকও সেদিন যথেষ্ঠ ছিল না দলের হার বাঁচানোর জন্য, যদিও তার সেই পারফরম্যান্স অনেকাংশেই ফিরিয়ে দেয় হারিয়ে যাওয়া আত্মবিশ্বাস। কিন্তু এরপরেই ঠিক যখন সিটি ফ্যানরা ভাবতে শুরু করেছে যে “সুপার কুল” বলে পরিচিত এই ফুটবলারটি আবার নিজের পুরোনো ফর্মে ফিরছেন, তখনই গ্যালাটাসারের কাছে তাকে বিক্রি করে দেওয়া হয়।
হয়তো সেই সময়ের পর থেকে এখন অবধি চারবার লিগ জয়ী ম্যানচেস্টার সিটির সমর্থকদের অনেকেই এসব পুরোনো কথা আর মনে রাখেনি, কিন্তু বলাই বাহুল্য যে একটা সময় তারা যখন হতাশায় তাদের দলের খেলা দেখাই ছেড়ে দিতে বসেছিলেন সেই সময় এই আন্ডাররেটেড এবং আন্ডার-অ্যাচিভার এলানোই কিন্তু নতুন করে তাদের স্বপ্ন দেখতে শেখান।
শুভ জন্মদিন এলানো ব্লুমার।

লেখাটি শেয়ার করুন

spot_img

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Related articles

আরো খবর

বিজ্ঞাপনspot_img

LATEST ARTICLES

2,875FansLike
8FollowersFollow
968FollowersFollow
81SubscribersSubscribe